শীতল পাটি ও বাঁশ-তালপাতার অলংকারে সজ্জিত দুর্গা প্রতিমা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গা পূজা শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে। তবে এবারের পূজোয় ভিন্ন আঙ্গিতে শীতল পাটির শাড়ি-ধুতিতে প্রতিমা সাজানো হয়েছে। এমনকি প্রতিমার সারা শরীরে তালপাতা, শীতল পাটি, খেজুর পাতা, বাশ ও কাগজের তৈরি অলংকার দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের মিনাবাজার এলাকার গোপীনাথ জিউর আখড়া মন্দিরে পরিবেশ বান্ধব এসব বস্তু দিয়ে দুর্গা পূজার সকল প্রতিমার সাজসজ্জা করা হয়েছে। ফলে পূজা মন্ডপ দেখতে উৎসুক দর্শনার্থী ও ভক্তদের আগ্রহের কমতি নেই। দলে দলে ভিড় জমিয়েছে পূজা মন্ডপে। এদিকে মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দরা দাবি করছেন, এসব বস্তু দিয়ে সাজসজ্জা করার ফলে পরিবেশ নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।মন্দির কমিটি সূত্রে জানা গেছে

, পরিবেশ বান্ধব ও মাটিতে পচনশীল বস্তু শীতল পাটির মধ্যে রং-তুলির আচড়ে সুন্দর সুন্দর সব কারুকাজ দিয়ে প্রতিমার শাড়ী ও ধুতি তৈরি করা হয়েছে। গহনা তৈরীতে ব্যবহার করা হয়েছে তালপাতা, শীতল পাটি, খেজুর পাতা ও কাগজ। ছোট ছোট বাঁশের টুকরা, বাঁশের মুলি দিয়ে মন্ডপে চারপাশ সজ্জিত করা হয়েছে। এতে প্রতিমা সহ সাজসজ্জার কাজ সারতে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ রয়েছে। ভিন্ন আঙ্গিকের এই থিম নিয়ে সাজসজ্জার কাজ করেছেন নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, মন্দিরের সাজসজ্জার কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। লাইটিং সহ আনুসাঙ্গিক কাজ চলছে। স্টেজের চারদিকে নানান রঙের পেইন্টিং সাটানো হচ্ছে। 

পরিবেশ বান্ধব থিম সম্পর্কে গোপীনাথ জিউর আখড়া মন্দিরের দুর্গা পূজা উদযাপন কমিটির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক পার্থ সারথি দাস বলেন, আমাদের এবারের থিম হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব পূজার মন্ডপ তৈরি করা। আমাদের এই মন্ডপে প্রতিমা, প্রতিমার কাপড় ও প্রতিমার অলংকার সহ মঞ্চের সাজসজ্জায় পচনশীল সব বস্তু ব্যবহার করা হয়েছে। দুর্গা প্রতিমা সহ সকল নারী প্রতিমার শরীরে শীতল পাটি দিয়ে তৈরি করা শাড়ি পড়ানো হয়েছে। একইভাবে শীতল পাটির তৈরি করা ধুতি পুরুষ প্রতিমার গায়ে পড়ানো হয়েছে। তালপাতা, শীতল পাটি, খেজুর পাতা, কাগজ ও বাঁশের চিকন কঞ্চি দিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন ধরনের অলংকার প্রতিমার গায়ে পড়ানো হয়েছে। দুর্গা, স্বরস্বতী,গনেশ, লক্ষী, কার্তিক সব বিভিন্ন প্রতিমা দিয়ে মন্ডপ সাজানো হয়েছে। আর প্রত্যেকটি প্রতিমার পেছনে খেজুর পাতা দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। এছাড়া পুরো মঞ্চটি বাঁশ, চাটাই, কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনিস্টিউটের শিক্ষার্থীরা এসব তৈরিতে কাজ করেছে। তবে পচনশীল বস্তু দিয়ে মন্ডপ তৈরির থিমটি আমরা (পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ) দিয়েছি।

পূজা মন্ডপের প্রতিমার অলংকার সহ সাজসজ্জার কাজ করেছে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনিস্টিউটের শিক্ষার্থীরা। এদের মধ্যে শিল্পী অভি কর নয়নের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, দুর্গা পূজার প্রতিমা, গায়ের অলংকার, স্টেজ সহ পুরো মন্ডপ পরিবেশ বান্ধব বস্তু দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশের যাতে ক্ষতি না হয়, সেটাই ছিলো আমাদের লক্ষ্য। সাধারণত, প্রতিমার শরীরে প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধাতব তৈরি গহনা ব্যবহার করা হয়। তবে সেসব বস্তু পচনশীল নয়, এতে করে পরিবেশের মারাত্নক ক্ষতি হয়। এ কারণে আমরা প্রতিমার গহনা তৈরিতে তালপাতা, শীতল পাটি, খেজুর পাতা ও কাগজ ব্যবহার করেছি। এছাড়া প্রতিমার শরীরে শাড়ী ও ধুতি তৈরিতে শীতল পাটি ব্যবহার করা হয়েছে। সেসব শীতল পাটিতে বিভিন্ন ডিজাউন করা হয়েছে। এছাড়া বাঁশের টুকরা, বাঁশের মুলি দিয়ে মন্ডপের অধিকাংশ কাজ করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান,  প্রতি বছর প্রতিমা বিসর্জন দেয়ার সময় প্লাস্টিক সহ অপচনশীল বিভিন্ন বস্তু নদীতে ফেলা হয়। এতে নদী সহ পরিবেশ দূষণ হয়। সেই কথা মাথায় রেখে যাতে নদীর পানি ও পরিবেশ যাতে দূষণ না হয়, তাই আমাদের এমন ভিন্ন কনসেপ্ট। আর আমরা যেসব উপাদান দিয়ে প্রতিম, স্টেজ ও অন্যান্য যে কাজ গুলো করেছি, এগুলো বিসর্জনের পর মাটির সাথে মিশে যাবে।

গোপীনাথ জিউর আখড়া মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক নবনিত সাহা বলেন, ‘বিভিন্ন অপচনশীল বস্তু ব্যবহার করে আমরা পৃথিবী ধ্বংস করে দিচ্ছি। সেই চিন্তাধারা থেকে এমন কনসেপ্ট এসেছে। 

নারায়ণগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ২২৪টি মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের তুলনায় এবার ৬টি পূজা মন্ডপ বেড়েছে। মণ্ডপগুলোতে বাহারি রঙের আলোকসজ্জা করা হয়েছে। 

নারায়ণগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার শিপন বলেন, যুগ যুগ ধরে এখানে সকল ধর্মের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করে আসছে এবং উৎসব পার্বন পালন করছে। এখানে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা কখনো পরিলক্ষিত হয়নি। এবার শারদীয় দূর্গোৎসব অত্যন্ত জমকালোভাবে আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি সকলের সহযোগিতায় এবং সকল ধর্মের মানুষের সমান অংশগ্রহনে শারদ উৎসব সফলভাবে অনুষ্ঠিত হবে। 

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে এবার ২২৪টি মন্ডপে শারদীয় দূর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এসব পূজা মন্ডপের নিরাপত্তার জন্য নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদা তৎপর থাকবে। আমরা ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে কয়েক দফা বৈঠক করেছি। এছাড়াও প্রতিটি মন্ডপের প্রতিনিধিগনের সাথে বৈঠক করে পূজা মন্ডপে সিসি ক্যামেরা লাগানো, নিজস্ব ভলান্টিয়ার নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সকল সংসদ সদস্যগণ, বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, র‌্যাব-১১, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বিআইডব্লিউটিএ, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র নারায়ণগঞ্জবাসীর সহযোগিতায় এবারের দূর্গোৎসব সফল হবে।