ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে ফুলের রাজ্যে দর্শনার্থীদের ভিড়

ফুলের রাজ্য হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার সাবদি গ্রাম রং বেরঙের ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। ফুলের চাষ করেই এখানকার ফুল চাষীরা জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষা বন্দরের উপজেলার সাবদী গ্রামের যেদিকে দু’চোখ যায় দেখা যায় ফুল আর ফুল। এ গ্রামের বাহারি রঙের ফুল সারা দেশে সরবরাহের পাশাপাশি মাস জুড়ে বাগানে থাকে ফুল প্রেমীদের আনাগোনা।  আবহা্ওয়া খারাপ থাকায় এবার ফুলের ফলন কম হ্ওয়ায় লোকসানের আশাংকায় হতাশ চাষীরা। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিস সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের বন্দরের উপজেলার কলাগাছিয়া ইউপির সাবদী গ্রাম। যতো দূর চোখ যায় শুধুই ফুলের সমারোহ। শুধু সাবদীই নয়, এ উপজেলার দিঘলদী, সেলশারদী, মাধবপাশা, আইছতলাসহ সোনারগাঁও উপজেলার সম্ভুপুরা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৮০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করা হয়। প্রায় ২০-২৪ জাতের ফুল চাষ করে বিক্রি করেন এখানকার কৃষকরা। এসব গ্রামের ১৫ থেকে ১৬ হাজার নারী-পুরুষ ফুল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই অঞ্চলের হতদরিদ্র কৃষকেরা ফুল চাষে স্বচ্ছলতার মুখ দেখেছেন। এখানকার ফুল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চাহিদা পূরণ করে থাকে। আবহা্ওয়া খারাপ থাকার কারনে এবার ক্ষতির মুখে চাষীরা। এসব বাগান থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পহেলা ফাল্গুন, বসন্তের ভালোবাসা দিবস ও ২১শে ফেব্রুয়ারী মাতৃভাষা ও মহান শহীদ দিবসকে ঘিরে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন চাষীরা। কলি দিয়ে গাজরা ও লহর বানাতে্ও ব্যস্ত গৃহবধূ-মেয়ে ও ছেলেরা। তবে  বৃষ্টির কারণে অন্য বছরের তুলনায় এবার ফুল চাষ কম হওয়াতে হতাশ চাষীরা। আগামী পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে লোকসানের আশঙ্কা চাষীদের। 

ফুল চাষী জাকির জানান, এবার যেই পরিমান ঝড় হয়েছে। এতে আমাদের জীবিত গাছ বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টিতে তলায় যাওয়ার পর আবার আমরা চারা রোপন করেছি। কিন্তু এখনো গাছে সম্পূর্ণ ফলন হচ্ছেনা। এবার যে পরিমান চাষাবাদে খরচ হয়ে গেছে সেই টাকা টা বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবো কিনা শংকায় আছি। এবার লাভের তেমন আশা দেখছি না। সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা করে তাহলে আমরা একটু চলতে পারবো।

ফুল চাষী রেখা দাস  বলেন, ডালিয়া, গাঁদা, মাম সহ বিভিন্ন ধরনের ফুল চাষ করি। এই ফুল দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এই গ্রাম থেকেই ফুলের অধিকাংশ চাহিদা মিটানো হয়। ফুল গাছের চারা এবার যা রোপন করেছি বেশীরভাগই ঝড়ের কারনে নষ্ট হয়ে গেছে। আবার রোপন করেছি কিন্তু এখনো ফলন দেখা যাচ্ছে না। লাভের আশা দূরে থাক এবার চালান উঠাতে পারলেই আমরা খুশি।

আরেক ফুল চাষী সাধন চন্দ্র মন্ডল বলন, এখন পর্যন্ত চারা লাগানো হয়েছে তিন দফা। তবে বৃষ্টিতে চারা নষ্ট হয়ে গেছে দুই দফা।
৩য় দফায় লাগানো গাছে এখনো ফুল ফুটেনি। পানিতে সব তলিয়ে গেছে। চালানই নাই এবার আমাদের। এই সময় এখনো ফুল ঠিকমত ফুটেনি আর কবে ফুটবে। দিবসগুলো আইসা পরতাছে। এই সময় আমাদের বিক্রি ভাল হয়। ফলন না হলে বিক্রি কিভাবে করবো। এই লাভ করতে পারবো না বলে মনে হয়। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু সুনজর দেয় এবং সরকারী সহযোগীতা পেলে ফুলের আরো ভাল চাষাবাদ করতে পারবেন বলে জানান চাষীরা।

এসব গ্রামের ফুল শুধু বানিজ্যিকভাবে বিক্রিই নয়। ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই রাজধানী সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো দর্শনার্থী ভিড় করেন। যার কারনে গড়ে উঠেছে সুন্দর একটি পর্যটন এলাকা। তারা রজনীগন্ধা, গাঁদা গ্লাডিওলাস, জারবেরা, বাগানবিলাস, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, কসমস, দোলনচাঁপা, নয়নতারা, মোরগঝুঁটি, কলাবতী, বেলি, জিপসি, চেরি, কাঠমালতি, আলমন্ডা, জবা, রঙ্গন, টগর, রক্তজবা সহ নানা বাহারি রঙের ফুলের গন্ধে নিজেকে হারিয়ে প্রকৃতির স্বাদ নেন। ফুলের বাগান দেখতে দূর দূরান্ত থেকে আসে হাজারো ফুল প্রেমিরা।  

ঢাকা থেকে আসা ফুল প্রেমী সাদিয়া বলেন, ফুলের টানে প্রায়ই ছুটে আসি এখানে। ফুলের এই মনোরম পরিবেশটা আমাদের অনেক ভাল লাগে। তাই স্বামীর সাথে এখানে বেড়াতে আসছি।

বন্ধুদের সাথে ঘুরতে আসা সাগর প্রধান বলেন, প্রত্যেক বছরই এই ফুল বাগান দেখতে আসি। ফুল অনেক ভাল লাগে। এখানে আসলে মন ভাল হয়ে যায়।

পরিবারের সাথে আসা স্কুল শিক্ষার্থী আনিকা আক্তার তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ফুল তো দেখতে সুন্দর। আমরা সবাই আসি ফুৃুল দেখতে এবং উপভোগ করতে। সাবদিতে এক সাথে এত রকমের ফুল দেখতে পেয়ে আমাদের অনেক ভাল লাগছে। কারন এখানে অনেক সুন্দর সুন্দর ফুল পাওয়া যায়। অনেক নানা রকমের ফুল পাওয়া যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জের উপ পরিচালক মুহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ৮০ হেক্টর জমিতে এবার ফুল চাষ হয়েছে। প্রায় ৫-৬ কোটি টাকার ফুল বিক্রি করার সম্ভাবনা রয়েছে। 
তিনি আরও বলেন, 

রাষ্ট্রীয়ত্ব যে ব্যাংকগুলো আছে যে গুলোতে ঋণের সুবিধা আছে। চাষীরা যদি মনে করে লাভজনক অর্থনৈতিক ফল চাষের ক্ষেত্রে ঋণ নিবে। সেক্ষেত্রে  ফুলের আবাদ বাড়াতে কৃষি ঋণের আমরা তাদের সহযোগীতা করবো।