ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যামেরা, কমবে অপরাধ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, খুন, সড়ক দুর্ঘটনা সহ নানা ঘটনার অপরাধী শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন  (এআই) সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে।  অপরাধ শনাক্ত করে মুহূর্তেই পুলিশ কন্ট্রোলরুমে সতর্ক সংকেত পাঠাতে সক্ষম হবে এই ক্যামেরা। ১৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে মহাসড়কের ২৫০ কিলোমিটারজুড়ে এই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে পুরো মহাসড়ক জুড়ে এই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে।

জানা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এখন জয়জয়কার। বিশ্বব্যাপী এআই সিসি ক্যামেরা ব্যবহৃত হচ্ছে। উন্নত বৈশিষ্ট্য এবং সক্ষমতার কারণে এটি নজরদারি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। রিয়েল-টাইমে ভিডিও ফিড বিশ্লেষণ করতে পারে। বস্তু শনাক্তকরণ, মুখ শনাক্তকরণ এবং আচরণ বিশ্লেষণসহ স্বয়ংক্রিয় ভিডিও সরবরাহ করে। এমনকি সন্দেহজনক ব্যক্তির আচরণ শনাক্ত এবং তার বিষয়ে সতর্ক করে। সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেয়। বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, মহাসড়ক এবং স্টেডিয়ামের মতো ভিড়ের ঘনত্ব নিরীক্ষণ করতে পারে, ভিড়ের প্রবাহের ধরনগুলো শনাক্ত করতে পারে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বর শনাক্ত এবং যানবাহন ট্র্যাকিং এবং পর্যবেক্ষণের বার্তা দেয়। একইসঙ্গে পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে সব ধরনের সতর্ক বার্তা দিতে পারে।   

হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত মহাসড়ক দুটি রিজিয়নে বিভক্ত। প্রথমবারের মতো হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এবং গাজীপুর রিজিয়নের দাউদকান্দি থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত এআই সিসি ক্যামেরা লাগানো হচ্ছে। এর মধ্যে সাইনবোর্ড থেকে সিটি গেট পর্যন্ত ৪৯০টি পোলের মাধ্যমে বসেছে ক্যামেরা। এগুলো নিয়ন্ত্রণে মেঘনাঘাট, দাউদকান্দি, হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়ন ও সিটি গেট এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে মনিটরিং সেন্টার। তবে মূল কমান্ড সেন্টার হাইওয়ে পুলিশ সদর দফতরে। ক্যামেরা ও অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপনের কাজ চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ১৫২ কোটি ৫৬ লাখ টাকার এই প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আর ১০০টি ক্যামেরা বসানোর কাজ বাকি আছে। ২০২১ সালের জুনে ‘হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীন ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হয়েছিল। ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ধরা হয়।

এই ক্যামেরা যেকোনো ধরনের অপরাধী শনাক্ত করতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের পরিচালক হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক বরকত উল্লাহ খান। তিনি বলেন, ‘অপরাধ দমনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এক হাজার ৪২৭টি এআই ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। এতে যাত্রী ও চালকদের জানমালের নিরাপত্তা যেমন বাড়বে, তেমন হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বাড়বে। কয়েক ধরনের ক্যামেরা লাগিয়েছি আমরা। যেমন বুলেট ক্যামেরা, পিটিজেট ক্যামেরা, লংভিশন ক্যামেরা ও চেক পয়েন্ট ক্যামেরা। এর মধ্যে লং ভিশন ক্যামেরাগুলো লাগানো হয়েছে মহাসড়কের লাগোয়া উঁচু ভবনের ওপর। যাতে কয়েক কিলোমিটার অনায়াসে রেকর্ড করতে সক্ষম। এছাড়া চেকপোস্টের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে লাগানো হয়েছে। ক্যামেরাগুলো গাড়ির নম্বর ও অতিরিক্ত গতি শনাক্ত করতে পারছে। এমনকি যানজটের মাঝেও নির্দিষ্ট গাড়িটি শনাক্ত করছে। ক্যামেরাগুলো চীনের হুয়াং প্রতিষ্ঠানের তৈরি এবং অত্যাধুনিক ক্ষমতাসম্পন্ন।’

নিয়ম ভাঙলে এসব ক্যামেরা গাড়ি শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দিতে পারে কিনা জানতে চাইলে বরকত উল্লাহ খান বলেন, ‘মূলত অনিয়ম, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, দুর্ঘটনার কারণ, অতিরিক্ত গতি, নাশকতা ও অপরাধীদের শনাক্ত করার জন্য লাগানো হয়েছে। যেহেতু এটি সেন্ট্রাল অ্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত, তাই বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যাবে। এখন গাড়ি শনাক্ত করে আমরা মামলা দিই। তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার পদ্ধতি এখনও চালু করা হয়নি। এই পদ্ধতি চালুর বিষয়ে বিআরটিএর সঙ্গে আলোচনা চলছে।’

ক্যামেরাগুলোর কারণে গত হরতাল-অবরোধের সময়ে বড় ধরনের কোনও সহিংসতা ও নাশকতা সৃষ্টির সাহস পায়নি কেউ বলেও উল্লেখ করেছেন অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক। তিনি বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সবগুলো ক্যামেরা এখনও চালু করতে পারিনি। ১০০টির মতো লাগানো বাকি আছে। আগামী জুনের আগেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে এই ক্যামেরা অপরাধী ধরতে সহযোগিতা করেছে আমাদের। পাঁচটি ঘটনার আসামি ধরা হয়েছে ক্যামেরা দেখে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার ভিডিও ধারণেও অসম্ভব সফলতা দেখিয়েছে। আশা করছি, সামনে এই সড়কে সব ধরনের অপরাধ কমে আসবে।’

এই ক্যামেরার মাধ্যমে সহজে অপরাধী শনাক্ত করা যাচ্ছে বলে জানালেন হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিওনের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. খাইরুল আলম। তিনি বলেন, ‘আগে দেখা যেতো রাস্তার পাশে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িগুলো পড়ে থাকতো। কারা দুর্ঘটনা ঘটালো, কারা দায়ী; তা বের করতে সময় লাগতো। বিশেষ করে হরতাল-অবরোধের সময় নাশকতা করলে শনাক্ত করা যেতো না। এই ক্যামেরাগুলো নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি নিশ্চিত করেছে। দ্রুত অপরাধীকে শনাক্ত করে দিচ্ছে। চালকরা এখন সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাই কমে গেছে। বিশেষ করে রফতানি পণ্যের চুরির সঙ্গে জড়িতদের সহজে ধরা যাচ্ছে। এতে যাত্রী ও চালকদের জানমালের নিরাপত্তা যেমন বেড়েছে, তেমনি হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বেড়েছে। কারণ ক্যামেরাগুলো দেখে অনেকে সতর্ক হয়ে গেছে।’

যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তা ছাড়াও সব ধরনের অপরাধী ধরা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কুমিল্লার সহকারী পরিচালক আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, ‘আগের চেয়ে দুর্ঘটনা ও অপরাধ কমেছে। এছাড়া কোনও গাড়ির সম্পর্কে তথ্য নিতে সহজ হচ্ছে আমাদের। সবমিলিয়ে এসব ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান সহজ হয়েছে। এছাড়া চালকরা সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। যাত্রী ও মালামালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে।’