ডিএনডিতে চরম দুর্ভোগে ২০ লাখ পানিবন্দি মানুষ

নারায়ণগঞ্জের ডিএনডি (ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা) এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২০ লাখ মানুষ। জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে ডিএনডি বাঁধের ভেতরে বসবাস করা ফতুল্লার লালপুর, পাগলা, নন্দলালপুর, নয়ামাটির বাসিন্দারা। এখানে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা কেমিক্যাল যুক্ত ময়লা পানি বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে দুর্গন্ধসহ ছড়িয়ে পড়ছে নানা পানিবাহিত রোগ।

১৯৬৪ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা এলাকা নিয়ে ডিএনডি প্রজেক্ট গড়ে তোলা হয়। মূলত কৃষি সেচ প্রকল্প হিসেবে এখানে বাঁধ দিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও স্বাধীনতার পর থেকে এখানে বাসা বাড়ি তৈরি করে কয়েক লাখ মানুষ বসবাস শুরু করে। পরবর্তীতে ডিএনডি বাঁধের ভেতরে ছোট-বড় মিলিয়ে ৬ হাজার শিল্প-কলকারখানা গড়ে ওঠে। এদিকে খালগুলো ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। গত সপ্তাহে ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে টানা বর্ষণে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার সড়কের ওপরে এখনো প্রায় দুই ফুট পানি জমে আছে। নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে গেছে। আবাসিক এলাকার ঘরবাড়ি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।

জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন ডিএনডি বাঁধের ভেতরে বসবাস করা ফতুল্লার লালপুর, পৌষাপুকুর পাড়, টাগার পাড়, পাগলা, নন্দলালপুর, নয়ামাটি, মুসলিমপাড়া, শহীদ নগর, দৌলতপুর, আদর্শ নগর, নূরবাগ, পিলকুনী, শিয়াচর, লালখার বাসিন্দারা। 

ফতুল্লার লালপুরের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির পানিতে সব ডুবে গেছে। ভয়াবহ এক পরিস্থিতি এলাকার। বর্ষা মৌসুমে বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতায় ভোগান্তির শিকার হয় এলাকার মানুষ। জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএনডি প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও এখনো সুফল পাচ্ছে না মানুষ। 

নন্দলালপুর এলাকার বাসিন্দা জলিল মিয়া বলেন, ‘বছরে অধিকাংশ সময় আমরা পানিবন্দি থাকি। এই সময়ে সড়কে নৌকা চলে। অনেক সময়ে বাধ্য হয়ে এই নোংরা পানি দিয়েই আমাদের হাঁটাচলা করতে হয়৷’

দৌলতপুরের বাসিন্দা জুনায়েদ আহমেদ বলেন, ‘জলাবদ্ধতা আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। এসব দেখার যেনো কেউ নেই। ভাবছি বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাব।’ 

বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকা ইতোমধ্যে পরিদর্শন করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান। তিনি পানিবন্দি মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করার আশ্বাস দিয়েছেন। এ বিষয়ে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি লজ্জিত ৷ আমরা ভেবেছিলাম এবার এ জায়গা শুকনা থাকবে। ফতুল্লার লালপুর এলাকা ফতুল্লার হার্ট। এখানে রাস্তা উঁচু এলাকা নিচু। তাই তিন লাখ মানুষ প্রায় পানিবন্দি হয়ে আছে৷ আমরা এখানে তিনটি পানির মোটর পাম্প বসিয়েছিলাম। এখানে একটি ট্রান্সফরমার ছিল, সেটা খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ট্রান্সফরমার না হলে তিনটা পাম্প চালানো যাবে না। এটার কারণে প্রচুর পানি জমে রাস্তা ও মসজিদ, মন্দিরে প্রবেশ করছে। এই পানি টানতে ৭২ ঘণ্টা লাগে। তবে একটা ট্রান্সফরমার লাগবে। একটা ভালো ট্রান্সফরমারের ব্যবস্থা করো, আমি টাকা দেব।’

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নারায়ণগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী এ.বি.এম. মাহবুবুল আলম খন্দকার জানান, ডিএনডি এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৭ সালে মেগা প্রকল্প শুরু হয় । ১,২৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকা নিয়ে এ ডিএনডি প্রকল্পের কাজ গত বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো সম্পন্ন হয়নি। তবে জলাবদ্ধতা কমাতে দিন-রাত পাম্প চালু রাখার কথা জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এ ছাড়া জায়গার জটিলতাসহ খনন করা খালগুলোতে ময়লা ফেলায় প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলছে বলে জানানএই কর্মকর্তা।

সূত্র মতে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) প্রকল্পের কাজ শুরু করে সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীন ১৯ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন। এর আগে, প্রথম ধাপে ২০১৬ সালে একনেকের সভায় ডিএনডি প্রকল্পের জন্য ৫৫৮ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প পাস হয়। পরবর্তীতে ডিএনডি এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে (দ্বিতীয় পর্যায়, প্রথম সংশোধনী) বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ১৩০০ কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্পের অগ্রগতি আশানুরূপ না হওয়ায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে ডিএনডিবাসী।